আসরের স্বলাত শেষ করে ইমাদ পা বাড়াল খেলার মাঠের দিকে। কিছুদূর যেতেই মাঠের কোণায় কিছু লোকের এক জটলা চোখে পড়ে। একটু এগিয়ে গিয়ে ঘটনা যা জানা গেল তা হলো – দুজন লোক একটি মুস্তাহাব আমলকে কেন্দ্র করে বাধানুবাধ বাধিয়েছে।
পরিস্থিতি কিছুটা বেসামাল হতে পারে আঁচ করতে পেরে ইমাদ এগিয়ে গিয়ে তাদের মাঝে ঢুকে পড়ল।
– “চাচাদ্বয়, আপনাদের বিষয়টার সমাধান আমি দিচ্ছি, একটু শান্ত হোন।” বলেই পাশে থাকা জুসওয়ালাকে হাঁক পাড়ে – “এই যে ভাই, তিনটা জুস দিন।”
বেশ বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তার সাথেই চাচাদের শান্ত করার চেষ্টাসমেত হাতে জুস তুলে দিয়ে বসে পড়ে সবুজ ঘাসের উপর।
– “চলেন চাচাদ্বয়, জুস খেতে খেতে আমরা কথা বলি।”
আচ্ছা তার আগে ছোট্ট একটা গল্প বলে নিই।
জানেন, সেদিন আমার বন্ধুর সাথে কি এক আজিব ঘটনা ঘটেছে?
আমার বন্ধু হিশাম, সেদিন তার দেরি হয়ে যাওয়ায় তড়িঘড়ি করে সে পরীক্ষার কেন্দ্রে প্রবেশ করছিলো। কিন্তু কেন্দ্রের প্রধান ফটকে দারোয়ান সাহেব তাকে আটকে দেয়। কেন জানেন?
(চাচাদ্বয়ের রাগ কিছুটা কমে আসছে, ঘটনা জানতে আগ্রহী হয়ে উঠছে)
তার এডমিট কার্ড, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সবই ঠিক ছিল। কিন্তু সমস্যা বাধলো তার কলমে।
– কলমে? (বামের চাচার জিজ্ঞাসা)
– জ্বি, কলমে।
– কেন, কলমে কী সমস্যা ছিল?
– ব্যাপার হলো, দারোয়ান সাহেব “ম্যাটাডোর অলটাইম” ব্যতীত অন্য কলম বহনকারী কাউকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দিচ্ছিলেন না। এমনকি তাদেরকে ছাত্র বলতেও তিনি নারাজ।
আমার বন্ধুর নিকট ছিল “ম্যাটাডোর হাই-স্কুল” নামের কলম। আর এখানেই ঘটল বিপত্তি।
– কি আজিব ব্যাপার! (বামের চাচার বিস্ময়)
আচ্ছা বলুন তো, দারোয়ান সাহেব কি এ কাজটি ঠিক করেছেন?
– “ঠিক মানে? এটাতো নেহায়েত একটি অন্যায়। আর যেনতেন অন্যায় নয়, বরং মহা অন্যায়।
কেননা এখানে দেখবে যে, পরীক্ষার্থীর এডমিট কার্ড ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সবকিছু ঠিক আছে কিনা, এবং তার সাথে নকল আছে কিনা। এই প্রধান বিষয়গুলো ঠিক থাকলে সে বৈধ পরীক্ষার্থী। ছোটখাট ভুল থাকলে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেবে।
আর কলম তো যে যেটা ব্যবহারে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সে সেটাই ব্যবহার করবে। এটা খুব স্বাভাবিক।
ধরতব্য নয় এমন অহেতুক বিষয় নিয়ে পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সময় নষ্ট করার তো কোন মানেই হয় না।”
(একটানে কথাগুলো বলে গেল ইমাদের ডান পাশের চাচা। বামের চাচাও মাথা নাড়িয়ে সায় দিলেন।)
– একদম ঠিক বলেছেন চাচা, একদম।
আর সাথে এটাও ঠিক যে আপনাদের এই হট্টগোলের বিষয়টাও ঐ দারোয়ান সাহেবের কাজটির মতোই।
(চাচাদ্বয় ঠিক যেন বুঝে উঠতে পারলেন না)
– একটু বুঝিয়ে বলবে, বাবা?
– জ্বি বলছি, শুনুন তবে।
আসলে এই দুনিয়াটা হলো আমদের জন্য একটি পরীক্ষাকেন্দ্র। আর এই পরীক্ষাকেন্দ্রের খাতা মূল্যায়নযোগ্য হওয়ার জন্য আমাদেরকে প্রথমে বৈধ পরীক্ষার্থী হওয়া আবশ্যক; অর্থাৎ ঈমানদার হওয়া আবশ্যক। অন্যথায় খাতা মূল্যায়নযোগ্য নয়।
আর এখানে বৈধ পরীক্ষার্থী হওয়ার জন্য এডমিট কার্ড হলো – “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ” এর বিশ্বাস, স্বীকৃতি ও মেনে নেওয়া।
সাথে দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো বিশ্বাস, স্বীকৃতি ও মেনে নেওয়া হলো আবশ্যকীয় কাগজপত্র।
আর এই পরীক্ষাকেন্দ্রে নকল হলো শিরক ও কুফর।
[সাথে নকল থাকলে শিক্ষার্থী যেমন বহিষ্কৃত হয়, তেমনি দ্বীনের এই পরীক্ষাকেন্দ্রে নকল (শিরক, কুফর) থাকলেও দ্বীন থেকে অটো-বহিষ্কৃত হয়ে যায়।]
এই পরীক্ষাকেন্দ্রেও যার এডমিট কার্ড ও আবশ্যকীয় কাগজপত্র আছে এবং নকলমুক্ত সে বৈধ পরীক্ষার্থী।
এমন সবাই-ই আমার দ্বীনী ভাই। তার সাথে আমার কোন দ্বন্দ্ব নাই। বরং চলবে প্রতিযোগিতা।
– কিসের প্রতিযোগিতা?
– পরীক্ষার খাতায় ভালো করার তথা নেক-আমলের প্রতিযোগিতা।
বাকী ছোট ছোট বিষয়গুলো হলো ঐ কলমের ঘটনার মতো। পরীক্ষার হলে বিভিন্ন পরীক্ষার্থী ভিন্ন ভিন্ন কলম ব্যবহার করা যেমন দোষণীয় কোন বিষয় নয়, ঠিক তেমনি দ্বীনের কোন আমলের ক্ষেত্রেও আহলে হক মুজতাহিদ ফকীহগণের মতের ভিত্তিতে ছোট ছোট বৈচিত্র্য থাকাও দোষণীয় কিছু নয়। এটা তো ইসলামের এক অনন্য সৌন্দর্য।
এডমিট কার্ড ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা এবং নকলমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র কলমের ভিন্নতার কারণে গেইটে আটকে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করা এবং ছাত্রই মনে না করা যেমন বাড়াবাড়ি ও অনুচিত কাজ, তদ্রুপ দ্বীনের প্রধান বিষয়গুলো সঠিক ও অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র ছোট ছোট আমলি বিষয়ে প্রান্তিকতা অবলম্বন করে নিজেদের মধ্যে বাড়াবাড়ি ও বিভক্তি তৈরি করা অনুচিত ও বর্জনীয় কাজ।
সবচেয়ে বড় কথা হলো – আল্লাহ তা’য়ালা মুসলিমদের ঐক্যকে ফরজ করেছেন, আর বিভক্তিকে হারাম করেছেন।
(সূরা আলে-ইমরানের ১০৩ নং আয়াত তার প্রমাণ)
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,
“মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব, তোমরা দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।”
(সূরা: হুজুরাত – ১০)
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি.) হতে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন –
“মুসলমান মুসলমানের ভাই।”
তাই আমাদের উচিত ভাই-ভাই দ্বন্দ্ব না করে, দ্বীনের প্রধান ও মৌলিক বিষয়কে ভিত্তি ধরে ঐক্যবদ্ধ থাকা ও আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা।
ততক্ষণে চাচাদ্বয়ের চোখ বেয়ে বেয়ে পানি ঝরছে।
– “বাবা, আমরা ভুলের মধ্যে ছিলাম, আমাদের বোধোদয় হয়েছে। আসলেই... নিজেদের মধ্যেই বাড়াবাড়ি-বিভক্তি মোটেও কাম্য নয়। তুমি আমাদের চোখ খোলে দিয়েছ। আল্লাহ তোমার জীবনকে বরকতময় করুন।”
– “এবার তাহলে দুজনে মুসাফাহা ও মুআনাকা করুন।”
বাহ! কি চমৎকার দৃশ্য!
এদিকে পশ্চিমাকাশে ডুবে যাচ্ছে রক্তিম সূর্য, আর সাথে মুছে যাচ্ছে দুটি হৃদয় থেকে মনোমালিন্যের কালো ছাপ, ঘুচে যাচ্ছে দূরত্ব, গড়ে উঠছে ঐক্যের ভিত।
ইমাদ অনুভব করতে লাগল এক জান্নাতি সুখের পরশ।
হৃদয়ে দোল খেতে লাগল অন্যরকম ভালোলাগার এক নির্মল হাওয়া।
